নাজিম উদ্দিন রানা, লোহাগাড়া |
সবুজ পাহাড়ে ঘেরা স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশির চাম্বি লেক যেন প্রকৃতির এক নীরব কবিতা। পাহাড়ের ছায়া যখন আয়নার মতো লেকের বুকে মিশে যায়, তখন মুহূর্ত হয়ে ওঠে মোহময়। কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, নির্মল বাতাস আর শান্ত জলরেখার টানে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা। পাহাড়, লেক আর জীববৈচিত্র্যের এ অপূর্ব সহাবস্থান লোহাগাড়ায় ইকো-ট্যুরিজমের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা, ফারাঙ্গা ও নারিশ্চা গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের আজিজনগর ইউনিয়নের পূর্ব চাম্বি গ্রাম নিয়ে প্রায় ১০০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ লেক। বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলের কয়েকটি সক্রিয় ঝরণার স্বচ্ছ জল মিলেই সৃষ্টি হয়েছে এ নৈসর্গিক জলাধার। পূর্বদিকে সমতল ভূমি এবং অন্য তিনদিকে পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় এখানকার দৃশ্যপট হয়ে উঠেছে অনন্য ও চোখ জুড়ানো।
লেকের আশপাশে রয়েছে হাতির প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। ভোর কিংবা বিকালের নরম আলোয় পাহাড়, লেক আর পাখির কলতান মিলেমিশে চাম্বি লেককে পরিণত করে এক নিখুঁত প্রকৃতি ভ্রমণ গন্তব্যে।
জানা যায়, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন চুনতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উদ্যোগে চাম্বি খালে রাবার ড্যাম নির্মাণ ও পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দেশের ১০টি রাবার ড্যাম প্রকল্পের একটি হিসেবে ২০১৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। এলজিইডির অংশগ্রহণমূলক ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ সেক্টর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এই ড্যাম চাম্বি লেককে দিয়েছে আজকের রূপ।
বর্তমানে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য লেকে রয়েছে কৃত্রিম পানির ফোয়ারা, পাখি ও প্রাণীর ভাস্কর্য, স্পিডবোট, প্যাডেল বোট, লাইফ বোট ও নৌকা। চালু আছে ফ্যামিলি ট্রেন ও ‘শুধু আমরাই’ রেস্টুরেন্ট। হ্রদের মাঝখানে অবস্থিত ‘মায়া দ্বীপে’ যেতে রয়েছে ড্রামভেলা। পাহাড়ের টিলায় নির্মিত গোল ঘরগুলো থেকে উপভোগ করা যায় সবুজ পাহাড় আর নীল জলের বিস্তৃত দৃশ্য, যা পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। তবে এখনো এখানে রাতযাপনের ব্যবস্থা চালু হয়নি।
পরিবেশবিদদের মতে, পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে চাম্বি লেক দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইকো-ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে পাহাড়-লেকের প্রাকৃতিক ভারসাম্যও রক্ষা পাবে।
চাম্বি খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সদস্য রেজাউল বাহার রাজা জানান, রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে পানির সংরক্ষণ সম্ভব হওয়ায় প্রায় ৫০০ একর জমিতে সেচ সুবিধা মিলছে। এতে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি মাছ চাষেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।
সমবায় সমিতির সভাপতি মাস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, কৃষির পাশাপাশি চাম্বি লেক লোহাগাড়াকে পর্যটনের মানচিত্রে তুলে ধরছে। ভবিষ্যতে কটেজ, সুইমিংপুল, ওয়াটার রাইড, খেলার মাঠ ও আধুনিক রেস্টুরেন্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, চুনতির চাম্বি রাবার ড্যাম একদিকে কৃষিতে সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে ঘিরে গড়ে উঠছে পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসন আরও উদ্যোগ নেবে।
প্রধান সম্পাদক : বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়দর্শী বড়ুয়া, প্রকাশক : প্রদীপ কান্তি দাশ, সম্পাদক : মো. নুরুল করিম আরমান, আইন বিষয়ক উপদেষ্ঠা : এ্যডভোকেট ফয়সাল আজিজ।
সম্পাদকীয় কার্ষালয় : প্রেসক্লাব ভবন (দ্বিতীয় তলা), প্রধান সড়ক, লামা পৌরসভা, বান্দরবান
ই-মেইল paharerkatha@gmail.com, মোবাইল: ০১৭৫০৪৪৪৯৯৬/০১৮১৪৮৪৫০৭৩
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত